রা ম সা গ র : দী ঘি   কি ন্তু   সা গ র

শুধু কি ঢেউ খেললেই সাগর? অথবা জোয়ার-ভাটার টান থাকলেই? যে দীঘি দেশের সবচেয়ে বড়, যাকে জড়িয়ে আছে হৃদয় ছোঁয়া উপকথা, সে দীঘি কি সাগর নয়? দিনাজপুরের রামসাগর শুধু নামেই নয়, প্রকৃতির নানান রুপকে ধারণ করে অনন্য এক সাগর।

এমনিতে দিনাজপুরের নাম শুনলেই মন মাঝে এক স্বপ্ন দোলা দিয়ে যায়। বিস্তৃত ধান ক্ষেত, জীবনের বৈচিত্র, মাথার ওপর খোলা আকাশ আর শীতের ভারী কুয়াশার চাদর। স্বপ্নালু হতেই হয়। কবি রফিক আজাদের কবিতায় এসেছে-

‘জীবনে তো কিছুই দেখলি না

ন্যুব্জপীঠ পানশালা ছাড়া। চল, তোকে

দিনাজপুরে নিয়ে যাবো

কান্তজীর মন্দির ও রামসাগর দেখবি,

বিরাট গোলাকার চাঁদ মস্ত খোলা আকাশ দেখবি,

পলা ও আধিয়ারদের জীবন দেখবি

গল্প-টল্প লেখার ব্যাপারে কিছু উপাদান

পেয়ে যেতেও পারিস’

এছাড়া দিনাজপুরের অন্যতম উলে­খযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যে কৃত্রিমভাবে গড়ে ওঠা নান্দনিক সৌন্দর্যের ‘স্বপ্নপুরী’ ও হিলি স্থলবন্দর রয়েছে। তবুও সবকিছু ছাপিয়ে দিনাজপুরের বড় আকর্ষণ কিন্তু রামসাগর। যেখানে দীঘি ও তার পাশ জুড়ে নানা আয়োজনে বিচিত্র রূপের সমাহার। দর্শনার্থীর মন থেকে কবিতার ছন্দ বা গল্পের প্লট বৃষ্টির ফোটার মতই ঝড়তে পারে।

রামসাগরের উপকথা সত্যিই হৃদয় ছোঁয়া। একবার প্রচন্ড খরা হলো। প্রকৃতির খেয়ালি নিষ্ঠুর আচরণে চারিদিকে পানির হাহাকার। প্রজাপ্রিয় রাজা প্রাণনাথ চিন্তায় অস্থির। কোথায় পানি? পানি ছাড়া জীবন চলবে কী করে? হঠাৎ রাজা একদিন স্বপ্ন দেখলেন। দৈব আদেশ পেলেন একটি দীঘি খুঁড়তে হবে। রাজা অনেক লোক লাগিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে দীঘি খনন করলেন। কিন্তু কী পরিহাস! এত খুঁড়েও দীঘিতে পানি উঠছে না।

আবারো দৈব আদেশ পেলেন রাজা। প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র রামকে দীঘি বলি দিতে হবে। তবেই উঠবে পানি। রাজা-প্রজা সবার মাঝে হায়-হায় রব। রাজপুত্র রাম যে সবার নয়নের মনি। প্রজারাও তাকে প্রানাধিক ভালোবাসে। কিন্তু কী আর করা! রাজা দীঘির মাঝে একটি স্বর্ণ মন্দির গড়লেন। রাম এলো সাদা পোষাক পড়ে, এক সাদা হাতির পিঠে চড়ে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন মন্দিরে। সাথে সাথে দীঘির তরা থেকে পানি উঠতে লাগলো। চোখের পলকে রাজপুত্রকে ছাপিয়ে পানিতে ভরে গেলো বিশাল দীঘি। প্রিয় রাজপুত্র রামের নামানুসারে সেই থেকে দীঘির নাম রামসাগর।

উপকথা ডালপালার মত ছড়ানো থাকে। ব্যতিক্রম আছে এই উপকথারও। কেউ বলে, রাজপুত্র নয় রাজা তার প্রিয় রানীকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। রানী মাঝে মাঝে মাছের রুপ নিয়ে দীঘির জলে ভেসে উঠে। রাজা মাঝে মাঝে দীঘির পাশে এসে কেঁদে বুক ভাসাতেন।

দিনাজপুর শহর থেকে অদূরেই আউলিয়াপুর তাজপুর গ্রামে রামসাগর দীঘি অবস্থিত। সদর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে।  রামসাগরের বিশাল আয়তন সত্যিই অবাক করার মত। তটভূমিসহ রামসাগরের আয়তন ৪ লাখ৩৭ হাজার ৪৯২ মিটার। শুধু দীঘির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৩১ মিটার ও প্রস্থ ৩৬৪ মিটার। গভীরতা ১০ মিটারের কাছাকাছি। পাড়ের উচ্চতা ১৩.৫ মিটার।

উপকথার সাথে ঐতিহাসিক বিবরণ স্বাভাবিক ভাবেই মেলে না। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী- দিনাজপুরের বিখ্যাত রাজা রামনাথের আমলে এই দীঘি তৈরি হয়। রামনাথ ১৭২২ থেকে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁরই নাম অনুসারে এই দীঘির নামকরণ হয়েছে। সে সময় এই দীঘি খনন কাজে ব্যয় হয়েছিলো ৩০ হাজার টাকা। বিশাল এ দীঘি খনন করতে ঘাম ঝরিয়েছিলো ১৫ লাখ শ্রমিক।

বড় রাস্তা থেকে একটি পিচঢালা পথ সামনের দিকে এগিয়ে রামসাগরে মিলেছে। গেটে রয়েছে টিকেটের ব্যবস্থা। গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই কিন্তু দীঘি চোখে পড়বে না। পাড়ের আড়ালে থাকা দীঘিকে দেখতে একটু সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এরপরে ইট বিছানো পথ দুভাগ হয়ে গেছে। উত্তর বা দক্ষিণের যে কোন পথ ধরে এগিয়ে গেলে উল্টো দিকের পথ বেয়ে আবারো এই জায়গায় এসে মিলতে হয়।

সুসজ্জিত পথের ধারে লাগানো গাছগুলোও সারিবদ্ধ। এক সারি ছোট গাছের পর লম্বা বড় গাছ। রাস্তার পরে উঁচু হয়ে থাকা ছোট টিলাগুলোও নানান গাছে ভরা। টিলা বেয়ে উঠলে জঙ্গলের আমেজ পাওয়া যায়। শুধু বড় দীঘি বলে নয়, চারপাশের এত এত সবুজ নিয়ে রামসাগর এক মায়াময় উদ্যানও বটে। ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে এই দীঘিকে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে রামসাগর জাতীয় উদ্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আরো আগে ১৯৬০ সালে রামসাগরকে বন বিভাগের আওতায় আনা হয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে রামসাগরের টিলাগুলো উঁচু ছিলো। যুদ্ধের সময় এগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়। উত্তর-পূর্ব কোনে সবচেয়ে রামসাগরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। এই পাহাড় ৪০ ফুট উঁচু। উত্তরে আরো আছে একটি দালানের ভগ্নাংশ। কেউ বলে এটা মন্দির আবার কেউ বলে মহারাজাদের বিশ্রামাগার।

রামসাগর দীঘিটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। দীঘিটির দক্ষিণের চেয়ে উত্তর দিকে গভীরতা খানিকটা বেশি। দীঘির মূল ঘাটটি পশ্চিম দিকের ঠিক মাঝখানে। উত্তর ও দক্ষিণে আরো দুটি ঘাট আছে। স্থানীয়রা ছাড়াও অনেকে রামসাগরে এসে আনন্দে শরীর ভেজান। ঘাঁট বেয়ে নেমে সাঁতরেও আসেন। মস্ত দীঘির কোথাও ভেসে থাকে গুচ্ছ গুচ্ছ শাপলা পাতা।

রামসাগর পর্যটন বিভাগের আওতাধীন। পর্যটন বিভাগের পক্ষ থেকে একটি আধুনিক বিশ্রামাগার স্থাপন করা হয়েছে। রামসাগরে ৭ টি পিকনিক কর্নার থাকলেও নেই তেমন কোন পরিচর্যার ছোঁয়া। অবহেলা আর অযতেœ এগুলো চেহারা পাল্টে গেছে। বসবার কোন উপায় নেই।

রামসাগরে শিশুদের জন্য একটি পার্কও রয়েছে। নানা ধরণের দোলনা, শিশুদের খেলনার পাশাপাশি পার্ককে আকর্ষণীয় করতে কিছু পশু-পাখির মূর্তিও লক্ষণীও। দায়িত্বরত প্রহরীদের চোখ এড়িয়ে শিশুরা সেইসব মূর্তির সাথে নিজেকে জড়িয়ে নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলে। শিশুপার্কের পাশ ঘেষে একটু নেমে গেলে আছে সত্যিকারের হরিণও। মায়াকাড়া হরিণগুলো রামসাগরের সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। এখানে আরো আছে মসজিদ, একটি ক্যাফেটেরিয়াও। এতোকিছুর সাথে এখানে আরো কিছু যুক্ত হলে অনেকটা ষোলকলা পূর্ণ হতে পারে। হয়তো সামনে ঝুলন্ত সেতু, শিশুদের জন্য আরো চিত্তাকর্ষক সামগ্রী যুক্ত হবে।

রামসাগরে গেলে সচেতন দর্শনার্থীর কাছে একটি বিষয় যেমন সুখের তেমনি দুঃখেরও মনে হতে পারে। তাজপুর পশ্চিম পাড়ার মোমিনুল ইসলাম নিজ উদ্যোগে একটি পাঠাগার গড়ে তুলেছেন। এই উদ্যোগ দেখে ভালো লাগার পাশাপশি মন খারাপ হয় এর অব্যবস্থাপনা দেখে। মোমিনুল ইসলামের ব্যক্তিগত চেষ্টায় গড়ে তোলা পাঠাগারের কোন স্বীকৃতি নেই। পাঠাগার ঘরেরও জরাজীর্ণ দশা। বসে পড়বার মত কোন সুব্যবস্থা নেই।

রামসাগরের আরেকটি বিষয় ভাবিয়ে তুলে দিনাজপুরবাসীকে। রাতের আঁধার নামার সাথে সাথে এখানে কাজকর্মেও যেন নেমে আসে অন্ধকার। সন্ধ্যা হবার পর তেমন কাউকে পাওয়া যায় না। বিশাল রামসাগর জুড়ে চলে নানা উটকো ঝামেলা। নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। আড়ালে আবডালে চলে ভাসমান দেহ পসারিনিদের মেলা। দিনের আলোতেও এখানে এসে আড়াল খুঁজে নেয়  অনেক জুটি। সবকিছুতেই আছে সুবিধাভোগী কিছু কালো মানুষের চলাচল। তারা যেমন ঠেকিয়ে টাকা নেন জুটির কাছে, তেমনি ভাগ নেন পসরা সাজিয়ে বসা রামসাগরের দোকানীদের কাছেও।

আরো কিছু অভিযোগ জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বারবার আসলেও প্রতিকার হয়নি। অবৈধভাবে মাছ ধরা, গাছ-গাছের ডাল কাটা থেকে কিছু অনিয়মের কথা। সত্য বলতে, এতবড় জায়গা ঘিরে যতটা নিরাপত্তা থাকা দরকার তা নেই। অনেকে টিকেট না কেটে চারদিক ঘিরে থাকা দেয়াল টপকে প্রবেশ করেন রামসাগরে। শোনা যায় নিয়োজিত শ্রমিকদের দূর্ণীতির কথাও। হরিণদের খাওয়ানোর কথা বলে গাছের পাতা নেয়ার সাথে সাথে তারা কেটে ফেলেন ডালও। বিক্রি করেন বাইরে। বসে মাতাল হবার প্রতিযোগিতাও। বেছে নেয়া নিভৃত জায়গা গাজার কল্কি ঘুরে হাত থেকে হাতে।

কিছু অভিযোগ গায়ে মেখেও রামসাগর কিন্তু সাগরই মনে হয়। উপকথা জেনে বিশাল দীঘিটাকে খুব আপন মনে হবে। রামের বিসর্জন গাঁথা মনে করুণ বাঁশির সুর বাজে। কখনো মনে হতে পারে রানী বুঝি এই উঠে এলো বিশাল এক মাছ হয়ে। রাজার কান্না মনে হয় ভাসছে বাতাসে বাতাসে।

দীঘির পানি, সবুজের সমারোহ সব মিলেমিশে একাকার হয়েছে এখানে। এ ধরণের মিশেল সত্যিই দুর্লভ।

সাগর না হলেও কতকিছুতেই তো আমরা ‘সাগর’ বিশেষণ জুড়ে দেই। জ্ঞানী লোককে যেমন জ্ঞানের সাগর বলে বিশেষায়িত করি। ঢেউ না খেললেও দীঘি রামসাগর তাই সাগরই। নামের সাথে মহাসাগর জুড়ে দেয়া থাকলেও বোধ হয় বেশি বলা হতো না।