ফো না লা প

নিপু তখন হাঁটছিল। গুলশানে গাউসুল আযম মসজিদের পাশ দিয়ে। একটা ঠিকানা খুঁজছিলো। লোকেশনটা বলেছিল, মসজিদের পাশে..। এতটুকুই মনে আছে। কোন পাশে, ডানে না বামে তা মনে নেই। ও মসজিদের এ পাশ ও পাশ কয়েকবার ঘুরলো। গরমে গায়ের জামা ঘেমে আটকে আছে শরীরের সাথে। এমন সময় ফোনটা এলো। ওর ক’দিন আগে কেনা মোবাইল সেটের রিংটোন একটু জোরেই কানে বাজলো। বিকট আওয়াজটা থামাতেই তাড়াতাড়ি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলো। অপরিচিত একটা নাম্বার। রিসিভ করলো।

-হ্যালো।

ওপারে কোন শব্দ নেই।

-হ্যালো। কে বলছেন?

একটু জোরেই বললো ও।

নাহ! কোন সাড়া শব্দ নেই। শরীরের সাথে সাথে এবার মাথাটাও গরম হয়ে গেলো।

-কে ভাই। কিছু বলছেন না কেন?

এবারে ওপাশ থেকে খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেলো। একটা মেয়ে কণ্ঠ।

বিরক্তিটা চরমে উঠলো। হাসির শব্দটা কান দিয়ে ঢুকে মাথাটাকেই গরম করে দিলো। চারপাশের কিছু লোক মনে হয় ওর দিকে তাকাচ্ছে। নিপু নিজেকে সামলে নিয়ে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলো, লিসেন; আপনি বলুনতো কে বলছেন?

-আমি.. আবার হাসির শব্দ।

-আশ্চর্য! কে আপনি?

-আমি ..। ওপাশের গলা খুব আস্তে শোনা যাচ্ছে। আমি ম্যাম।

-ধ্যাত!

ফোনটা কেটে দিল ও। এমনিতে গরমে একাকার। কে ফোন করে জ্বালাচ্ছে?  ও তো ফোনে কখনো দুষ্টামিও করেনা। আশেপাশে তাকালো। দু একজন এখনো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে অপ্রস্তুত দেখে মনে হয় মজা পাচ্ছে। মোবাইল সেটটা পকেটে রেখে দ্রুত হেটে সামনে এগিয়ে গেলো। বাঙ্গালীর চিরচারিত স্বভাব মনে হয় এটা। সব কিছুতে মজা খুঁজে বেডায়।

নাহ! আজকে আর খুঁজবেনা। ফোনটা এসে মাথাটা মনে হয় গুলিয়ে দিল। এখন মনে হচ্ছে লোকেশনটা অন্য ছিল। আচ্ছা কে ফোন করল? মৃনাল সেনের একটা কি যেন ছবি দেখিছিলো। এক বিত্তশালীর ঘরে এক প্রকারের বন্দী মেয়েটা টেলিফোনে উল্টোপাল্টা ডায়াল করতো। কথা বলার মানুষ খুঁজতো। কেউ জিজ্ঞেস করলে সুরেলা গলায় বলতো, আমি..।

-কিন্তু আমাকে কেন রে ভাই। নিজের মনে কথা বলে নিপু। নিজের ঝামেলায় বাঁচিনা। যতোসব আজগুবি কান্ড।

একটা সিএনজি ডেকে উঠে পরে। অন্যসময় হলে খরচ বাঁচাতে বাসের চিন্তা করতো। সিএনজিটা কেবল চলতে শুরু করেছে। এমন সময় আবার ফোন। না! এবারে ওর ফোন নয়। সিএনজি ড্রাইভারের।

-ও কি! থামলে কেন?

সিএনজি থামাতে দেখে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলো। ড্রাইভার ওর কথার উত্তর না দিয়ে নিজের মনে মোবাইলে কথা বলছে। কিছুটা সময় গেলো। কি আশ্চর্য! ব্যাটার কথার শেষ হওয়ার নাম গন্ধ নেই। কি সুন্দর হেসে হেসে রসের কথা বলছে।

-এই তুমি যাবে?

ওর স্বভাব বিরুদ্ধ একটা ধমক দিল নিপু। ধমকে কাজ হলো। কথা বন্ধ করে সিএনজি টান দিল ড্রাইভার। যাক বাবা বাঁচা গেল। ভেজা শার্ট। পেছনের রেক্সিনে হেলান দেয়া যাচ্ছেনা। বাম হাতটা ভেতরে ঢুকিয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঘাম মুছলো। পুরো শরীর একেবারে ভিজে গেছে। এবারে ডান হাত চালালো।

আবার ফোন। এবারে ড্রাইভারের নয়, ওরই। পকেট থেকে বের করতেও ইচ্ছা করছেনা। রিংটোন বাজছে জোরে জোরে।

-ভাই ফোন আসছে ধরেন। ড্রাইভার বললো।

কথাটা কেমন তেতো মনে হলো। মনে হচ্ছে পকেট থেকে মোবাইল সেটটা বের করে রাস্তায় একটা আছাড় মারে। অবশ্য নিপু নিজেও জানে আছাড় মারবেনা। এসব ভাবনাই সার।

হাতের ঘাম প্যান্টের উপর ভাল মত মুছে নেয়। আস্তে করে মোবাইল সেটটা বের করে।

এই সেরেছে! তমালের ফোন। পাওনাদার! নিপুর কাছে দুই হাজার টাকা পাবে। কি করবে? ধরবে কি ধরবেনা ভাবতেই কলটা মিসড্ কল হয়ে গেলো। ব্যাক করার প্রশ্নই আসেনা। আবার মোবাইল ফোনটা পকেটে ফেললো। এবার মনে হয় পুরো পা’টাই কেঁপে উঠলো। আবার রিংটোন! বিরক্তির একশেষ আর কি!

পাওনাদার তমালই ফোন করেছে। এবার না ধরে উপায় নেই।

রিসিভ করতেই ও কথা বলার আগে তমালই শুরু করলো।

-কি ব্যাপার প্রথমবার ধরলি না কেন?

-রাস্তায় ভাই। আস্তে বললো ও।

-বুঝেছি।

তমালের কথায় কেমন শ্লেষ মেশানো। কি বুঝেঝে ও? কি বুঝাতে চাইছে?

-তমাল যা বলার তাড়াতাড়ি বল।

-বা! ভালই তো রং দেখাচ্ছিস!

এরপরের কথাগুলো শ্লীল অশ্লীলে মেশানো হলো। ও নিজে অবশ্যই শ্লীলতা বজায় রেখেছে। অশ্লীলটা তমালই চালালো। তবু মেজাজ গরম করতে পারলোনা ও। ও পাওনাদার! একটু তোয়াজ ওর প্রাপ্য।

সিএনজি ততক্ষণে কাকরাইল চলে এসেছে। জ্যামে আটকেছে। ড্রাইভারের কাছে একটা ছোট্ট পাখা দেখলো। ওটা দিয়েই ও মনের সুখে বাতাস করছে। গানও মনে হয় গাইছে। শোনা যাচ্ছেনা।

বাসের হর্ণের পোঁ শব্দের সাথে মিলিয়ে আরেকটা কল এলো। নাহ! বিরক্ত হলে চলবেনা। এটা আসতেই থাকবে। এজন্যই তো ওকে কেনা হয়েছে। একেবারে খাঁটি নোকিয়া। পাঁচ হাজার ছ ’শো টাকা লেগেছে কিনতে। ওর রুমমেট শ্রাবণ মেডিটেশন করে। সবসময় ডায়লগ ঝারে, বি পজিটিভ ভায়া, টেক ইট ইজি..

আশ্চর্য! শ্রাবণই ফোন করেছে। কাকতালীয় ভাবে মিলে গেলো।

-হ্যালো, হ্যা-শ্রাবণ।

-তুই বাজার না করে চলে গেলি কেন?

শ্রাবণের গলায় ঝাঁঝ। না ও বিষয়টাকে ইজি নেয়নি। লেকচারের সাথে কাজের মিল পাওয়া যাচ্ছেনা।

-টেক ইট ইজি রেইন, আমার একটু তাড়া ছিল।

ওর ডায়লগটা ওকেই ফিরিয়ে দিল। মাঝে মাঝে শ্রাবণকে ও রেইন বলে ডাকে।

-বিটলামি করবিনা। বাজারের ডেট থাকলেই তোর তাড়া থাকে।

রেইন মানে শ্রাবণের গলার ঝাঁঝ আরো বেড়েছে। বলা চলে চরমে উঠেছে। নিপুও আর নিজেকে সামলাতে পারলোনা।

-তুই বলতো এর আগে কবে বাজারের ডেট আমি মিস করেছি?

-অতশত বুঝিনা। তুই বাজার না করে গেলি কেন? স্টুপিড একটা!

-কি?

এরপর কলার ও রিসিভার দুজনই বাহ্য জ্ঞান হারালো। একে ওপরকে দোষারোপ করতে লাগলো। ফাঁকে টুকটাক গালিগালাজ। অবশ্য নিপু নিজের দোষ দেখছেনা। এই সামান্য একটা ব্যাপারে যখন মেডিটেশন করা শ্রাবণই নিজেকে সামলাতে পারলোনা, তখন ওর কি….

সিএনজিটা চলে এসেছে। এসেছে বলতে সায়দাবাদ ব্রীজ পর্যন্ত। এ পর্যন্তই ভাড়া হয়েছিল। বাকী পথটা ওকে হেঁটে বা রিক্সায় যেতে হবে। সিএনজি ড্রাইভারকে গুনে গুনে একশ বিশ টাকা দিতে হলো।

-এই রিক্সা যাবে?

-কই?

-মীরহাজিরবাগ।

বলেই উঠে পড়লো নিপু। রিক্সা চলতে শুরু করলো। মীরহাজিরবাগে ওর মেসের সামনে আসেতে আসতে মোবাইল ফোনটা আরো দুবার বেজেছিল। নিপু ধরেনি। বলা চলে, ধরার সাহস পেলোনা নিপু।

সিঁড়ি বেয়ে ছ’তলায় উঠলো ও। দরজা তালা মারা। শ্রাবণ মনে হয় নীচে খেতে গেছে। যখন দরজার তালা খুলতে পকেটে হাত ঢুকিয়েছে ঠিক তখনই আবার ফোন এলো। মোবাইল সেট ও চাবি দুটোই একসাথে বের করলো। চাবিটা বাম হাতে পাস করে ডান হাতে মোবাইল সেটটা,নেয় নিপু। আরি! মা ফোন করেছে। ছি! এতক্ষণ ফোন ধরা হয়নি।

তড়িঘড়ি রিসিভ করলো নিপু।

-হ্যালো মা।

-হ্যাঁ খোকা! সেই কখন থেকে তোকে ফোন করছি..

মা একটা মিষ্টি ধমক দিলো। ধমকটা খেয়েও বেশ ভাল লাগছে।

-মা একট রাস্তায় ছিলাম তো।

নিপু মোবাইলটাকে ঘাড়-গলার সন্ধিতে গুজে দিল। কথা বলতে বলতে দু’হাত ব্যবহার করে পুরোনো তালাটা খুললো।

দরজাটা ধাক্কা দিতেই তালার মত পুরোনো দরজা ক্যাঁচ ক্যাঁচ একটা শব্দ তুললো।

-কিসের শব্দ রে।

ওপাশ থেকে মা জিজ্ঞেস করলো।

-দরজা খুললাম মা।

-ও মা! তুই কেবল এলি! যে গরম বাইরে। তোর কি সর্দি ধরেছে? গলাটা কেমন বসা মনে হচ্ছে?

এত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেয়ে ও মিষ্টি করে একটু হাসলো।

রুমে ঢুকে কথা বলতে বলতেই কায়দা করে শার্টটা খুলে রশিতে ঝুলিয়ে দিল।

আরো অনেক কথা হলো মা’র সাথে। মনটা ভাল হয়ে গেলো। নাহ! ফোনের দরকার আছে। সেই চার শতাধিক কিলো দূরের মা ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে। বেশ ভাল লাগছে।

নিপু এখন দক্ষিণের জানালার পাশে বসে আছে। কারেন্ট না থাকলেও ও গায়ে মাখছেনা। জানালা বেয়ে ভাল বাতাস আসছে। পুরোনো কাঠের চেয়ারটায় বসে পা তুলে দিয়েছে জানালায়। মোবাইলে গেম খেলছে ও। গাড়ীটা বেশ চালাচ্ছে। আগের মোবাইল সেটটা ওর এত দামী ছিলনা। এত সুন্দর গেমও ছিলনা।